দম বৃদ্ধির ব্যায়ামের উপকারিতা [শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যায়াম]
সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য আমাদের সঠিক নিয়মে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। প্রতিদিন নিয়ম মেনে ব্যায়াম করলে শরীরের রক্ত সঞ্চালন এবং অক্সিজেনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। দম বৃদ্ধির ব্যায়ামের উপকারিতা জানলে আপনি নিজের ফুসফুসকে অনেক বেশি শক্তিশালী করতে পারবেন। আজকে আমরা দম বাড়ানোর বিভিন্ন সহজ ও কার্যকর উপায় জানাব।
দম বৃদ্ধির ব্যায়ামের নাম ও ব্যায়াম গুলো কি কি?
অনেকেই প্রশ্ন করেন যে শরীরের দম বাড়ানোর জন্য আমাদের ঠিক কোন ব্যায়ামগুলো করা উচিত। দম বৃদ্ধির জন্য মূলত শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম এবং কিছু হালকা কার্ডিও কসরত সবচেয়ে ভালো কাজ করে। নিচে কয়েকটি জনপ্রিয় দম বৃদ্ধির ব্যায়ামের নাম এবং সেগুলোর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হলো:
১) গভীর শ্বাস (Deep Breathing):
এটি সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর একটি পদ্ধতি। গভীর শ্বাস নেওয়া ফুসফুসের পুরো অংশ সক্রিয় করতে সাহায্য করে। প্রতিদিন সকালে ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নিলে ফুসফুসের স্বাস্থ্য উন্নত হয়।
২) প্রানায়াম (Anulom Vilom):
প্রানায়াম ব্যায়াম কিভাবে করবেন তা জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে অনেক সাহায্য করে। এক নাসিকা দিয়ে শ্বাস নেওয়া এবং অন্য নাসিকা দিয়ে ছাড়া হয়।
৩) বেলুন ফোলানো ব্যায়াম:
বেলুন ফোলানো ব্যায়াম শিশু এবং বড়দের জন্য খুবই কার্যকর। এটি ফুসফুসের পেশী শক্তিশালী করে এবং শ্বাসকষ্ট কমাতে সাহায্য করে।
৪) ব্রেথ হোল্ডিং:
নির্দিষ্ট সময় শ্বাস ধরে রাখার এই ব্যায়াম ফুসফুসের ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। ধীরে ধীরে সময় বাড়ালে ফুসফুস শক্তিশালী হয় এবং নিয়ন্ত্রণ বাড়ে।
৫) কার্ডিও এক্সারসাইজ:
দৌড়ানো, সাইক্লিং, এবং দ্রুত হাঁটা দম বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর ব্যায়াম। কার্ডিও এক্সারসাইজ শরীরে অক্সিজেন প্রবাহ বৃদ্ধি করে এবং ফিটনেস উন্নত করে।
দম বৃদ্ধির ব্যায়ামের উপকারিতা এবং প্রয়োজনীয়তা –
দম বৃদ্ধির ব্যায়ামের উপকারিতা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। শরীরকে কর্মক্ষম রাখতে হলে আমাদের ফুসফুসকে সুস্থ রাখা সব থেকে বেশি জরুরি কাজ। নিয়মিত দম বাড়ানোর ব্যায়াম করলে শরীরের প্রতিটি কোষে পর্যাপ্ত পরিমাণ অক্সিজেন পৌঁছে যায়।
যারা নিয়মিত খেলাধুলা করেন তাদের জন্য এই ব্যায়ামগুলো করা অনেক বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম উপকারিতা কেবল শারীরিক নয় বরং মানসিক প্রশান্তির জন্যও অনেক বেশি কার্যকর।
দমবাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর ব্যায়াম কি?
অনেকেই জানতে চান যে দ্রুত ফলাফল পাওয়ার জন্য দমবাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর ব্যায়াম কি হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যে ইন্টারভাল ট্রেনিং এবং গভীর শ্বাসের সমন্বয় সবচেয়ে ভালো ফল দেয়। আপনি যদি ৫ মিনিট দৌড়ানোর পর ১ মিনিট ব্রিদিং এক্সারসাইজ করেন তবে চমৎকার ফল পাবেন।
এটি ফুসফুসকে নতুন করে অক্সিজেন গ্রহণ করতে এবং শরীরকে রিকভার করতে সাহায্য করে থাকে। এই পদ্ধতিটি ব্যবহার করে অ্যাথলেটরা তাদের পারফরম্যান্স অনেক বেশি উন্নত করে তুলে থাকেন।
দম কম হলে কি ব্যায়াম করবেন?
যদি আপনার মনে হয় যে আপনি খুব অল্পতেই হাঁপিয়ে যাচ্ছেন তবে চিন্তার কিছু নেই। দম কম হলে কি ব্যায়াম করবেন সেটি নিয়ে আমাদের বিশেষ কিছু পরামর্শ এখন দেওয়া হলো। শুরুতে খুব কঠিন ব্যায়াম না করে আপনি কেবল হালকা গভীর শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস করুন।
প্রতিদিন ১০ মিনিট হাঁটা শুরু করুন এবং সাথে সাথে শ্বাসের ব্যায়াম চালিয়ে যেতে থাকুন। ধীরে ধীরে আপনার ফুসফুসের শক্তি বাড়বে এবং আপনি আগের চেয়ে অনেক বেশি দম পাবেন।
ফুসফুস শক্তিশালী করার ব্যায়াম ও তার নিয়ম –
ফুসফুসের ক্ষমতা বাড়ানোর ব্যায়ামটি সঠিকভাবে করার জন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
১. (অবস্থান): প্রথমে একটি শান্ত জায়গায় মেরুদণ্ড একদম সোজা করে আরামদায়কভাবে বসুন। মেরুদণ্ড সোজা রাখা ফুসফুসের পূর্ণ প্রসারণের জন্য খুবই জরুরি।
২. (প্রস্তুতি): শরীরকে শিথিল করুন এবং মন শান্ত রাখুন।
৩. (শ্বাস গ্রহণ): ধীরে ধীরে নাক দিয়ে গভীর শ্বাস নিন। অনুভব করুন আপনার বুক ও ফুসফুস অক্সিজেন দিয়ে ভরে যাচ্ছে।
৪. (শ্বাস ত্যাগ): মুখ দিয়ে খুব আস্তে আস্তে এবং লম্বা সময় নিয়ে শ্বাসটি ছেড়ে দিন।
৫. (পুনরাবৃত্তি): একইভাবে এই প্রক্রিয়াটি অন্তত ১৫-২০ মিনিট ধরে চালিয়ে যান।
দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতার জন্য টিপস –
আমাদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে ফুসফুসের প্রাকৃতিক ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। তাই সঠিক যত্নের কোনো বিকল্প নেই:
- ধৈর্য ও অনুশীলন: ব্রিদিং এক্সারসাইজের পূর্ণ উপকারিতা পেতে হলে আপনাকে ধৈর্যের সাথে প্রতিদিন এটি অনুশীলন করতে হবে।
- বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: প্রয়োজনবোধে সঠিক ফুসফুস থেরাপি ব্যায়াম শুরু করার জন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
- ধূমপান বর্জন: ফুসফুসকে দীর্ঘ সময় সতেজ রাখতে আজই ধূমপান ত্যাগ করুন।
- সঠিক খাদ্যাভ্যাস: নিয়মিত সুষম খাবার গ্রহণ করলে ফুসফুসের টিস্যুগুলো অনেক বেশি সতেজ থাকে।
- পর্যাপ্ত পানি পান: প্রচুর পরিমাণে পানি পান করলে ফুসফুসের আস্তরণ আর্দ্র থাকে, যা সহজে শ্বাস নিতে সাহায্য করে।
শ্বাসকষ্ট কমানোর ব্যায়াম ও ঘরোয়া উপায় –
যাদের নিয়মিত শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে তারা অনেক সময় সাধারণ কাজ করতেও হাঁপিয়ে যান। তাদের জন্য শ্বাসকষ্ট কমানোর ব্যায়াম এবং সঠিক জীবনযাত্রা পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। প্রতিদিন ডায়াফ্রাম্যাটিক ব্রিদিং করলে ফুসফুসের নিচের অংশ অনেক বেশি সচল এবং কার্যকর থাকে।
এটি আপনার শরীরের কার্বন ডাই অক্সাইড বের করে দিতে অনেক বেশি সাহায্য করে। দম বাড়ানোর এক্সারসাইজ বাংলাদেশ এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এখন অনেক বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে।
রোগভিত্তিক উপকারিতা –
হাঁপানি রোগীর জন্য শ্বাস ব্যায়াম:
হাঁপানি বা অ্যাজমা রোগীদের জন্য শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সময় বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। তবে সঠিক এবং নিয়ন্ত্রিত হাঁপানি রোগীর জন্য ব্যায়াম করলে এই সমস্যা অনেকটা কমে। নিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যায়াম করার নিয়ম জানলে হাঁপানির টান অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়।
শরীরচর্চার সময় অতিরিক্ত চাপ না নিয়ে ধীরে ধীরে শ্বাসের গতি বৃদ্ধি করা উচিত। অক্সিজেন বাড়ানোর ব্যায়াম রক্তে অক্সিজেনের স্যাচুরেশন বজায় রাখতে চমৎকার ভাবে কাজ করে থাকে।
দুর্বল ফুসফুস:
COPD রোগীদের জন্য রেসপিরেটরি এক্সারসাইজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা পদ্ধতি। দুর্বল ফুসফুস শক্তিশালী করতে শ্বাস নিয়ন্ত্রণ ব্যায়াম নিয়মিত করা উচিত। ফুসফুস পরিষ্কার রাখা দীর্ঘমেয়াদে শ্বাস সমস্যার ঝুঁকি কমায়।
ফুসফুসের ব্যায়াম ট্রিটমেন্ট ও থেরাপির সুবিধা:
যাদের ফুসফুসে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা আছে তাদের জন্য বিশেষ কিছু মেডিকেল ব্যায়াম রয়েছে। এই ফুসফুসের ব্যায়াম ট্রিটমেন্ট সাধারণত একজন দক্ষ ফিজিওথেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে করা অনেক বেশি নিরাপদ। এটি ফুসফুসের ভেতরে জমে থাকা কফ পরিষ্কার করতে এবং শ্বাস নিতে সাহায্য করে।
নিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাস থেরাপি ব্যায়াম করলে শ্বাসযন্ত্রের ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যায়। ডাক্তাররা এখন অনেক রোগীকে সুস্থ হওয়ার জন্য এই ধরণের বিশেষ থেরাপির পরামর্শ দেন।
দম বাড়ানোর যোগব্যায়াম ও প্রানায়াম গাইড –
ভারতীয় প্রাচীন চিকিৎসা শাস্ত্রে দম বাড়ানোর জন্য যোগব্যায়ামের ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দম বাড়ানোর যোগব্যায়াম করলে শরীরের স্নায়ুতন্ত্র শান্ত হয় এবং মানসিক চাপ অনেক কমে। নিয়মিত প্রানায়াম ব্যায়াম করলে ফুসফুস এবং হৃদপিণ্ডের কার্যকারিতা অনেক বেশি উন্নত হয়ে ওঠে।
শ্বাস নিয়ন্ত্রণ ব্যায়াম শিখলে আপনি যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেকে শান্ত রাখতে সক্ষম হবেন। যোগব্যায়াম করার সময় সুতির ঢিলেঢালা পোশাক পরা স্বাস্থ্যের জন্য অনেক বেশি আরামদায়ক হয়।
প্রানায়াম ব্যায়াম কিভাবে করবেন?
প্রানায়াম করার জন্য প্রথমে একটি আরামদায়ক আসনে মেরুদণ্ড সোজা করে বসে পড়তে হবে। এরপর এক নাক বন্ধ করে অন্য নাক দিয়ে ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নিতে হবে। কিছুক্ষণ শ্বাস ধরে রেখে বিপরীত নাক দিয়ে সেটি খুব ধীরে ধীরে ছেড়ে দিতে হবে।
প্রানায়াম ব্যায়াম কিভাবে করবেন – এটি শেখার জন্য আপনি কোনো বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে পারেন। প্রতিদিন সকালে ১০ থেকে ১৫ মিনিট প্রানায়াম করলে শরীরের তেজ এবং বুদ্ধি বাড়ে। এটি মনকে শান্ত রাখতে এবং একাগ্রতা বৃদ্ধি করতে জাদুর মতো কাজ করে থাকে।
দম বাড়ানোর ফিটনেস এক্সারসাইজ ও অ্যাথলেটিক পারফরম্যান্স –
খেলোয়াড় বা অ্যাথলেটদের জন্য দম এবং স্ট্যামিনা বৃদ্ধি করা সফলতার জন্য প্রধান শর্ত। দম বাড়ানোর ফিটনেস এক্সারসাইজ করলে দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করার মানসিক ও শারীরিক শক্তি পাওয়া যায়। কার্ডিওভাসকুলার অ্যাক্টিভিটি এবং শ্বাসের ব্যায়ামের সমন্বয় আপনার কর্মক্ষমতাকে অনেক বেশি শক্তিশালী করে তুলবে।
যারা দ্রুত দৌড়াতে চান তাদের জন্য শ্বাস নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতি শেখা অত্যন্ত জরুরি। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে আপনি আপনার শরীরের অক্সিজেনের ব্যবহার অনেক বেশি দক্ষ করতে পারবেন।
কিভাবে দম বাড়ানো যায় দ্রুত ও সহজে?
দ্রুত দম বাড়াতে চাইলে আপনাকে ব্যায়ামের ধারাবাহিকতা এবং তীব্রতার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। কিভাবে দম বাড়ানো যায় দ্রুত তার জন্য আপনাকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় নিয়ম মেনে ব্যায়াম করতে হবে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠা-নামা করা দম বাড়ানোর জন্য একটি অত্যন্ত কার্যকর এবং সহজ উপায় হতে পারে।
নিয়মিত সাতার কাটলে ফুসফুসের ক্ষমতা অন্য যেকোনো ব্যায়ামের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। পর্যাপ্ত ঘুম এবং বিশ্রাম আপনার শরীরকে পরবর্তী দিনের ব্যায়ামের জন্য প্রস্তুত করে তুলবে।
দম বাড়ানোর সহজ উপায় ও টিপস –
দম বাড়ানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সারাদিন সচেতনভাবে বুক ভরে শ্বাস গ্রহণ করা। আমরা অধিকাংশ মানুষই খুব ছোট ছোট শ্বাস নেই যা ফুসফুসের জন্য যথেষ্ট নয় মোটেও। দম বাড়ানোর সহজ উপায় হিসেবে সবসময় সোজা হয়ে বসার এবং হাঁটার চেষ্টা করুন নিয়মিত।
সোজা হয়ে থাকলে ফুসফুস পর্যাপ্ত জায়গা পায় এবং শ্বাস নিতে অনেক বেশি সুবিধা হয়। প্রতিদিন অন্তত একবার প্রাণ খুলে হাসলে আপনার ফুসফুসের চমৎকার একটি প্রাকিতিক ব্যায়াম হয়ে যায়।
শ্বাসব্যায়াম এবং গভীর শ্বাস নেওয়ার প্রক্রিয়া –
প্রতিদিন অন্তত দশ বার গভীর শ্বাস নিলে শরীর থেকে অনেক বিষাক্ত পদার্থ বেরিয়ে যায়। গভীর শ্বাস নেওয়া বা ডিপ ব্রিদিং স্ট্রেস হরমোন কমাতে অনেক বেশি সাহায্য করে থাকে। এটি আপনার হৃদস্পন্দনকে স্বাভাবিক রাখে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আপনি যখন গভীর শ্বাস নেন তখন আপনার মস্তিষ্ক অনেক বেশি সচল হয়ে ওঠে। শ্বাসব্যায়াম করার জন্য একটি শান্ত এবং কোলাহলমুক্ত জায়গা বেছে নেওয়া সব সময় ভালো।
অক্সিজেন সাপোর্ট এবং রেসপিরেটরি এক্সারসাইজ –
শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিলে আমরা খুব দ্রুত ক্লান্ত এবং দুর্বল হয়ে পড়ি। অক্সিজেন সাপোর্ট ছাড়াই সুস্থ থাকতে চাইলে ফুসফুসকে নিয়মিত কর্মক্ষম রাখার কোনো বিকল্প নেই। বিভিন্ন ধরণের রেসপিরেটরি এক্সারসাইজ ফুসফুসের অ্যালভিওলাইগুলোকে প্রসারিত করতে অনেক বেশি সাহায্য করে থাকে।
এটি শরীরের রক্তে অক্সিজেনের প্রবাহ বাড়িয়ে দেয় এবং কার্বন ডাই অক্সাইড দ্রুত অপসারণ করে। নিয়মিত এই অভ্যাস করলে আপনার ফুসফুসের ক্ষমতা দীর্ঘ সময় ধরে অটুট থাকবে নিশ্চিত।
কার্ডিও এক্সারসাইজ এবং ফুসফুস পরিষ্কার রাখা –
ফুসফুস পরিষ্কার রাখতে এবং হৃদযন্ত্র ভালো রাখতে কার্ডিও এক্সারসাইজের কোনো বিকল্প নেই। দ্রুত হাঁটা, সাঁতার কাটা অথবা সাইকেল চালানো ফুসফুসকে অনেক বেশি সচল রাখতে সাহায্য করে। কার্ডিও এক্সারসাইজ করলে শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বাড়ে যা ফুসফুসের ভেতর থেকে ময়লা বের করে দেয়।
বাতাস পরিষ্কার থাকলে এবং নিয়মিত ব্যায়াম করলে ফুসফুসের রোগ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। সুস্থ থাকার জন্য প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট ঘাম ঝরানো ব্যায়াম করা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।
শ্বাস নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক চাপ কমানো –
আমরা যখন দুশ্চিন্তায় থাকি তখন আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি অনেক বেশি বেড়ে যায় দ্রুত। শ্বাস নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে আমরা খুব সহজেই আমাদের মস্তিষ্ককে শান্ত করার সংকেত পাঠাতে পারি। বড় বড় শ্বাস নিলে শরীরের প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম সক্রিয় হয় যা প্রশান্তি ফিরিয়ে আনে।
মানসিক চাপ কমানোর জন্য ব্রিদিং মেডিটেশন সারা বিশ্বে এখন একটি স্বীকৃত পদ্ধতি হিসেবে জনপ্রিয়। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে আপনি আপনার রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে এবং ধৈর্য শক্তি বাড়াতে পারবেন।
শ্বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ ও ফিটনেস উন্নয়ন –
সঠিকভাবে শ্বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে আপনার শারীরিক ফিটনেস অনেক উন্নত স্তরে পৌঁছাবে। শ্বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে শরীরের এনার্জি খরচ অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব হয়। যারা জিমে ব্যায়াম করেন তাদের জন্য সঠিক সময়ে শ্বাস ছাড়া এবং নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়মিত শ্বাসের ব্যায়াম করলে আপনার শরীরের মাংসপেশিগুলো অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত পেয়ে দ্রুত গঠিত হয়। ফিটনেস উন্নয়ন এর জন্য ব্যায়ামের পাশাপাশি ফুসফুসের যত্ন নেওয়া প্রতিটি মানুষের একান্ত কর্তব্য।
শ্বাসকষ্ট কমানোর ঘরোয়া ব্যায়াম ও পরামর্শ –
ঘরে বসেই কিছু বিশেষ আসন এবং শ্বাসক্রিয়ার মাধ্যমে আপনি শ্বাসকষ্টের প্রকোপ অনেকটা কমাতে পারেন। শ্বাসকষ্ট কমানোর ঘরোয়া ব্যায়াম হিসেবে পার্সড লিপ ব্রিদিং বা ঠোঁট গোল করে শ্বাস ছাড়া খুব কার্যকর। এটি শ্বাসনালীতে বাতাসের চাপ বজায় রাখে এবং ফুসফুসকে দীর্ঘ সময় খোলা রাখতে সাহায্য করে।
এছাড়াও বাষ্প নেওয়া বা স্টিম ইনহেলেশন ফুসফুসের পথ পরিষ্কার রাখতে অনেক বেশি সাহায্য করে। নিয়মিত গরম পানি পান করা এবং ঠান্ডা থেকে দূরে থাকা শ্বাসকষ্টের রোগীদের জন্য জরুরি।
শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যায়াম করার নিয়ম ও সময় –
ব্যায়াম করার জন্য ভোরের সময়টি সবথেকে উপযুক্ত কারণ তখন বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা বেশি থাকে। শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যায়াম করার নিয়ম হলো সবসময় খালি পেটে অথবা খাওয়ার দুই ঘণ্টা পর ব্যায়াম করা। ব্যায়াম করার সময় তাড়াহুড়ো না করে প্রতিটি শ্বাসের ওপর পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া অনেক জরুরি।
বদ্ধ ঘরের পরিবর্তে খোলা বারান্দা অথবা বাগানে বসে ব্যায়াম করা স্বাস্থ্যের জন্য অনেক ভালো। শরীর খুব ক্লান্ত থাকলে বা জ্বর হলে এই ব্যায়ামগুলো করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
শ্বাস ব্যায়াম কতদিন করলে ফল পাওয়া যায়?
যেকোনো অভ্যাসের মতো শ্বাস ব্যায়াম এর সুফল পেতে হলে আপনাকে অন্তত কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। সাধারণত নিয়মিত দুই থেকে তিন সপ্তাহ ব্যায়াম করলে আপনি নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসে পরিবর্তন অনুভব করবেন। শ্বাস ব্যায়াম কতদিন করলে ফল পাওয়া যায় তা নির্ভর করে আপনার বর্তমান শারীরিক অবস্থার ওপর।
যারা আগে থেকেই ব্যায়াম করেন তারা খুব দ্রুত অর্থাৎ ১০-১২ দিনের মধ্যেই উপকার পান। তবে দীর্ঘস্থায়ী সুফল পেতে হলে এই ব্যায়ামগুলো আপনার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে নিতে হবে।
বাচ্চাদের দম বাড়ানোর ব্যায়াম ও খেলাধুলা –
ছোট বাচ্চাদের ফুসফুস গঠনের সময় তাদের সঠিক শারীরিক পরিশ্রম এবং খেলাধুলা করা অত্যন্ত জরুরি। বাচ্চাদের দম বাড়ানোর ব্যায়াম হিসেবে দৌড়ঝাঁপ, লুকোচুরি খেলা অথবা ফুটবল খেলা খুব ভালো কাজ করে। এছাড়াও বাচ্চাদের বেলুন ফোলাতে দিলে তাদের ফুসফুসের পেশিগুলো অনেক বেশি মজবুত এবং শক্তিশালী হয়।
ছোটবেলা থেকেই সাঁতার শিখলে বাচ্চাদের শ্বাসযন্ত্রের রোগ হওয়ার ঝুঁকি একদম থাকে না বললেই চলে। বাচ্চাদেরকে ধূমপানমুক্ত পরিবেশে বড় করা তাদের ফুসফুসের স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি একটি বিষয়।
নতুনদের জন্য গাইড –
যদি আপনি একদম নতুন হন তবে শুরুতে মাত্র ৫ মিনিট দিয়ে আপনার যাত্রা শুরু করুন। কিভাবে শুরু করবেন, তা নিয়ে চিন্তা না করে কেবল গভীর শ্বাস নেওয়া শুরু করে দিন। প্রথম কয়েকদিন আপনার সামান্য মাথা ঘুরতে পারে তবে নিয়মিত করলে এটি একদম ঠিক হয়ে যাবে।
আপনার শরীরের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে ধীরে ধীরে ব্যায়ামের সময় এবং তীব্রতা বৃদ্ধি করুন। একটি নির্দিষ্ট সময় প্রতিদিন ব্যায়াম করলে আপনার শরীর খুব দ্রুত এই অভ্যাসে অভ্যস্ত হবে।
কিভাবে শুরু করবেন –
শুরুর জন্য সহজ নির্দেশনা:
প্রথমে প্রতিদিন পাঁচ থেকে দশ মিনিট শ্বাস ব্যায়াম দিয়ে শুরু করুন। ধীরে ধীরে সময় বাড়িয়ে প্রতিদিন বিশ থেকে ত্রিশ মিনিট অনুশীলন করুন। খালি পেটে ব্যায়াম করলে বেশি উপকার পাওয়া যায় এবং শ্বাস নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়।
কত সময় ব্যায়াম করবেন:
শ্বাস ব্যায়াম কতদিন করলে ফল পাওয়া যায় তা নিয়মিততার উপর নির্ভর করে। প্রতিদিন নিয়মিত ব্যায়াম করলে দুই থেকে তিন সপ্তাহে উন্নতি দেখা যায়। দম বাড়ানোর এক্সারসাইজ বাংলাদেশে অনেকেই সকালে খালি পেটে করেন।
সতর্কতা এবং ভুলগুলো এড়ানো –
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা:
ব্যায়াম করার সময় হঠাৎ বেশি চাপ দিলে শ্বাসকষ্ট বাড়তে পারে। যদি শ্বাস নিতে কষ্ট হয় তবে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্রাম নেওয়া জরুরি। ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ব্যায়াম শুরু করলে ঝুঁকি কম থাকে।
সাধারণ ভুল:
অনেকেই দ্রুত ফল পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত ব্যায়াম করেন, যা ক্ষতিকর হতে পারে। শ্বাস ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ না করলে ব্যায়ামের সঠিক উপকার পাওয়া যায় না। নিয়মিত না করলে ফুসফুসের ক্ষমতা বাড়ানোর উপায় কার্যকর হয় না।
শ্বাস নিতে কষ্ট হলে কি করবেন? তাৎক্ষণিক সমাধান –
হঠাৎ শ্বাস নিতে কষ্ট হলে আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকার চেষ্টা করা সবথেকে বেশি জরুরি। শ্বাস নিতে কষ্ট হলে কি করবেন তা জানা থাকলে অনেক বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। প্রথমে সোজা হয়ে বসে পড়ুন এবং সামনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে নিজের হাত হাঁটুর ওপর রাখুন।
ধীরে ধীরে নাক দিয়ে শ্বাস নিয়ে ঠোঁট গোল করে খুব আস্তে বাতাস ছেড়ে দিন। যদি কষ্ট বাড়তে থাকে তবে দেরি না করে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
উপসংহার –
পরিশেষে বলা যায় যে সুস্থ জীবনের জন্য দম বৃদ্ধির ব্যায়ামের কোনো বিকল্প নেই আমাদের জীবনে। নিয়মিত দম বৃদ্ধির ব্যায়ামের উপকারিতা ভোগ করতে হলে আপনাকে অবশ্যই নিয়মানুবর্তী হতে হবে প্রতিদিন। ফুসফুস শক্তিশালী হলে আপনার জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত হবে এবং আপনি অনেক প্রাণবন্ত থাকবেন।
আপনি যদি আজ থেকেই শুরু করেন, তবে খুব দ্রুত পরিবর্তন অনুভব করতে পারবেন। নিয়মিত শ্বাস নিন, সুস্থ থাকুন এবং আপনার ফুসফুসকে আজীবন সতেজ ও কর্মক্ষম করে রাখুন। সুস্থ জীবনযাপনের জন্য প্রতিদিন কিছু সময় শ্বাস ব্যায়াম করা অভ্যাসে পরিণত করুন।