হঠাৎ বুক ধড়ফড় করার কারণ ও প্রতিকার
হঠাৎ বুক ধড়ফড় করা বা প্যালপিটেশন একটি অত্যন্ত সাধারণ বা মাঝেমধ্যে ভীতিকর শারীরিক অনুভূতি হতে পারে। সাধারণত হৃদস্পন্দন যদি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দ্রুত হয় তবে তাকেই মূলত বুক ধড়ফড়ানি বলে থাকি। এই আর্টিকেলে আমরা বুক ধড়ফড় করার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে আলোচনা করার চেষ্টা করব।
আপনার সুস্বাস্থ্যের জন্য Your Care BD এর বিশেষজ্ঞ দল এই তথ্যবহুল গাইডটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তৈরি করেছে। এখানে আপনি বুক ধড়ফড়ানি সংক্রান্ত প্রায় সকল প্রয়োজনীয় তথ্য এবং কার্যকরী স্বাস্থ্য পরামর্শ একত্রে পাবেন।
হঠাৎ বুক ধড়ফড় করা আসলে কি এবং কেন এটি হয়ে থাকে?
প্যালপিটেশন বা বুক ধড়ফড় করা বলতে মূলত নিজের হৃদস্পন্দন নিজে অনুভব করার একটি বিশেষ অবস্থাকে বুঝায়। স্বাভাবিক অবস্থায় আমাদের হূদযন্ত্র নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করলেও আমরা সাধারণত এর স্পন্দন খুব একটা বুঝতে পারি না। তবে যখন হূদপিণ্ড খুব জোরে বা দ্রুত স্পন্দিত হয় তখন আমরা এটি স্পষ্টভাবে অনুভব করতে পারি।
অনেক সময় মনে হতে পারে যে হূদপিণ্ড কোনো একটি বিট এড়িয়ে গেছে বা খুব দ্রুত ধুকপুক করছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই সমস্যাটি ক্ষণস্থায়ী হয় এবং এটি কোনো মারাত্মক রোগের লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয় না। তবে বারবার এমনটি হলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় শারীরিক পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
হঠাৎ বুক ধড়ফড় করার কারণ সমূহ যা আপনার জানা প্রয়োজন –
১) রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া জনিত সমস্যা:
রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে গেলে হূদপিণ্ডকে সারা শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ করতে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। এই অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফলেই মূলত রোগীদের মাঝে হঠাৎ করে বুক ধড়ফড় করার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
২) থাইরয়েড গ্রন্থির হরমোন জনিত ভারসাম্যহীনতা:
শরীরে থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা বেড়ে গেলে বিপাকীয় হার দ্রুত হয় যা সরাসরি আপনার হূদস্পন্দনকে প্রভাবিত করে। হাইপারথাইরয়েডিজম নামক এই শারীরিক অবস্থার কারণে অনেক রোগীই দীর্ঘস্থায়ী বুক ধড়ফড়ানির সমস্যায় ভুগে থাকেন বলে জানা যায়।
৩) শরীরে পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশনের প্রভাব:
শরীরে পানির অভাব দেখা দিলে রক্তের ঘনত্ব বেড়ে যায় এবং হূদপিণ্ডকে রক্ত পাম্প করতে অনেক বেগ পেতে হয়। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান না করলে ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্য নষ্ট হয়ে বুক ধড়ফড়ানির মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে।
৪) জ্বরের কারণে হূদস্পন্দনের গতি বৃদ্ধি:
শরীরে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে মেটাবলিজম বা বিপাক ক্রিয়া বেড়ে যায় যা হূদপিণ্ডকে দ্রুত স্পন্দিত হতে বাধ্য করে। উচ্চ মাত্রার জ্বরের সময় বুক ধড়ফড় করা একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রক্রিয়া যা জ্বর কমলে ঠিক হয়ে যায়।
৫) নিম্ন রক্তচাপ বা লো ব্লাড প্রেসার:
রক্তচাপ হঠাৎ কমে গেলে মস্তিষ্ক ও অন্যান্য অঙ্গে রক্ত পৌঁছাতে হূদপিণ্ড তার স্পন্দনের গতি অনেকটা বাড়িয়ে দেয়। এই দ্রুত স্পন্দনই মূলত রোগীর কাছে বুক ধড়ফড়ানি বা প্যালপিটেশন হিসেবে খুব স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়ে থাকে। Read also: বুকের ব্যথা হওয়ার কারণ ও প্রতিকার
মানসিক কারণ এবং জীবনযাত্রার প্রভাব যা বুক ধড়ফড়ানি বাড়ায় –

১) অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপের ক্ষতিকর প্রভাব:
আমাদের মস্তিষ্ক যখন কোনো কারণে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করে তখন শরীরে স্ট্রেস হরমোন বা অ্যাড্রেনালিন নিঃসৃত হয়। এই হরমোন সরাসরি হূদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয় যার ফলে মানুষ হঠাৎ করে বুক ধড়ফড়ানি বা অস্বস্তি অনুভব করে।
২) প্যানিক অ্যাটাক বা তীব্র ভয়ের অনুভূতি:
হঠাৎ করে কোনো আতঙ্ক বা প্যানিক অ্যাটাক শুরু হলে শরীরের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে রোগীর মনে হতে পারে যে তার হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে যা মূলত তীব্র বুক ধড়ফড়ানি মাত্র।
৩) অতিরিক্ত ক্যাফেইন এবং ধূমপানের ক্ষতিকর অভ্যাস:
চা, কফি বা এনার্জি ড্রিংকসে থাকা ক্যাফেইন হূদপিণ্ডকে উত্তেজিত করে এবং স্পন্দনের স্বাভাবিক গতি নষ্ট করে দেয়। ধূমপান এবং তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারে রক্তনালী সংকুচিত হয় যা বুক ধড়ফড়ানি বাড়ানোর জন্য অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী।
৪) মদ্যপান ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া:
অ্যালকোহল বা বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য গ্রহণের ফলে শরীরের স্নায়ুতন্ত্র উত্তেজিত হয় এবং হূদস্পন্দনের ছন্দ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়। নিয়মিত মদ্যপান করলে হূদপিণ্ডের পেশি দুর্বল হয়ে পড়ে যা দীর্ঘমেয়াদী বুক ধড়ফড়ানি বা মারাত্মক হূদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
Also read: বুক জ্বালাপোড়া কমানোর ৭টি ঘরোয়া উপায়
Your Care BD থেকে বিশেষ স্বাস্থ্য টিপস এবং ঘরোয়া প্রতিকার –
বুক ধড়ফড়ানি কমাতে yourcarebd.com সব সময় রোগীদের জীবনযাত্রায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়ে থাকে বলে জানবেন। আপনার যদি হঠাৎ বুক ধড়ফড় শুরু হয় তবে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করে দ্রুত স্বস্তি পেতে পারেন।
-
শান্ত থাকা: বুক ধড়ফড়ানি শুরু হলে আতঙ্কিত না হয়ে খুব শান্ত হয়ে এক জায়গায় বসে পড়ুন।
-
গভীর শ্বাস: নাক দিয়ে ধীরে ধীরে লম্বা শ্বাস নিন এবং মুখ দিয়ে খুব ধীরে বাতাস ছেড়ে দিন।
-
শীতল জল: চোখে মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিন অথবা এক গ্লাস ঠান্ডা পানি ধীরে ধীরে পান করুন।
-
বিশ্রাম: শরীরের সকল পেশি শিথিল করে দিন এবং শান্ত পরিবেশে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকুন।
-
ভ্যাসলভা ম্যানুভার: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পেট শক্ত করে বা কাশির মাধ্যমে হূদস্পন্দন কমানোর কৌশল প্রয়োগ করতে পারেন।
হূদরোগ সংক্রান্ত জটিলতা যা বুক ধড়ফড়ানির কারণ হতে পারে –
১) কার্ডিয়াক অ্যারিদমিয়া বা অনিয়মিত হূদস্পন্দন:
হূদপিণ্ডের সংকেত চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে হূদস্পন্দন অনিয়মিত হয়ে পড়ে যা মূলত মেডিকেল ভাষায় অ্যারিদমিয়া নামে পরিচিত। এই অবস্থায় হূদপিণ্ড কখনও খুব দ্রুত আবার কখনও খুব ধীরে চলে যা রোগীর জন্য বেশ কষ্টকর হয়।
২) হূদপিণ্ডের ভাল্বের সমস্যা:
হূদপিণ্ডের রক্ত প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ভাল্বগুলো ঠিকমতো কাজ না করলে রক্ত চলাচলে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে থাকে। ভাল্বের ছিদ্র বা সংকোচন জনিত সমস্যার কারণে অনেক সময় রোগীর দীর্ঘস্থায়ী বুক ধড়ফড়ানির মতো লক্ষণ প্রকাশ পায়।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে বা হাসপাতালে যেতে হবে?
অধিকাংশ বুক ধড়ফড়ানি ক্ষতিকর না হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত মারাত্মক কোনো রোগের সংকেত দিতে পারে। যদি বুক ধড়ফড়ানির সাথে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দেয় তবে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে দ্রুত যোগাযোগ করুন।
-
বুকে তীব্র ব্যথা বা চাপের মতো অনুভূতি হলে এটি হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে।
-
নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা শুরু হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে জানবেন।
-
হঠাৎ করে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হলে অবহেলা করা ঠিক নয়।
-
অতিরিক্ত ঘাম হওয়া এবং সাথে বুক ধড়ফড়ানি থাকলে তা হূদপিণ্ডের জটিল কোনো সমস্যার ইঙ্গিত প্রদান করে।
-
হূদস্পন্দন দীর্ঘক্ষণ ধরে অনিয়মিত থাকলে এবং কোনোভাবেই তা স্বাভাবিক অবস্থায় না ফিরলে দ্রুত ব্যবস্থা নিন।
সঠিক রোগ নির্ণয় পদ্ধতি –
সঠিক রোগ নির্ণয় ছাড়া বুক ধড়ফড়ানির উপযুক্ত চিকিৎসা করা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সাধারণত রোগীর শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনা করে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
১) ইসিজি বা ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম পরীক্ষা:
ইসিজি পরীক্ষার মাধ্যমে হূদপিণ্ডের বৈদ্যুতিক কার্যক্রম এবং স্পন্দনের ছন্দ খুব সহজেই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বুঝতে পারেন। এটি বুক ধড়ফড়ানির কারণ অনুসন্ধানে ব্যবহৃত সবচেয়ে প্রাথমিক এবং অত্যন্ত কার্যকর একটি পরীক্ষা হিসেবে দুনিয়াজুড়ে স্বীকৃত।
২) ইকোকার্ডিওগ্রাম বা হূদপিণ্ডের আল্ট্রাসাউন্ড:
এই পরীক্ষার মাধ্যমে হূদপিণ্ডের গঠন, ভাল্বের অবস্থা এবং রক্ত প্রবাহের চিত্র খুব স্পষ্টভাবে পর্দার মাধ্যমে দেখা সম্ভব। হূদপিণ্ডের পেশি কতটা শক্তিশালী বা কোনো গঠনগত সমস্যা আছে কিনা তা ইকোকার্ডিওগ্রামের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে বোঝা যায়।
৩) হল্টার মনিটরিং এবং স্ট্রেস টেস্ট:
২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা ধরে হূদস্পন্দন পর্যবেক্ষণ করার জন্য হল্টার মনিটর নামক একটি ছোট যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এছাড়া পরিশ্রমের সময় হূদপিণ্ড কেমন আচরণ করে তা জানার জন্য ট্রেডমিলে হাঁটার মাধ্যমে বিশেষ স্ট্রেস টেস্ট করা হয়।
বুক ধড়ফড়ানি প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদী জীবনযাত্রার ইতিবাচক পরিবর্তন –
নিয়মিত জীবনযাত্রায় সঠিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারলে আপনি বুক ধড়ফড়ানির মতো সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারেন সহজেই। নিচে কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ আলোচনা করা হলো যা আপনার হার্টকে সুস্থ রাখতে অনেক বেশি সাহায্য করবে।
-
সুষম খাদ্য: প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রচুর পরিমাণে সবুজ শাকসবজি, ফলমূল এবং ওমেগা-৩ যুক্ত খাবার যুক্ত করার চেষ্টা করুন।
-
নিয়মিত ব্যায়াম: দিনে অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা হালকা শরীরচর্চা হূদপিণ্ডের পেশিকে অনেক বেশি মজবুত করে তোলে।
-
পর্যাপ্ত ঘুম: প্রতিদিন রাতে অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা নিরবিচ্ছিন্ন ঘুম শরীরের সকল হরমোন এবং স্নায়ুকে শান্ত রাখে।
-
মানসিক প্রশান্তি: মেডিটেশন, যোগব্যায়াম বা ধর্মীয় প্রার্থনা করার মাধ্যমে মানসিক অস্থিরতা এবং দুশ্চিন্তা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করুন।
-
লবণ ও চিনি: অতিরিক্ত লবণ এবং চিনিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী একটি সিদ্ধান্ত হবে।
শেষ কথা:
হঠাৎ বুক ধড়ফড় করার কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকলে আপনি যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারবেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি কেবল জীবনযাত্রার ভুল অভ্যাসের ফল হলেও অবহেলা করা কোনোভাবেই উচিত কাজ হবে না। আপনার হার্ট এবং শ্বাসযন্ত্রের যেকোনো সমস্যায় বিশেষজ্ঞ পরামর্শ পেতে নিয়মিত ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট yourcarebd.com।
আমরা আপনাকে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে প্রতিনিয়ত কাজ করছি। সুস্থ থাকুন, হার্টের যত্ন নিন এবং যেকোনো জরুরি অবস্থায় অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে মোটেও কার্পণ্য করবেন না।